ওশানটাইমস ডেস্ক : ২২ মে ২০২৬, শুক্রবার, ১৬:১৬:১০

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের স্বার্থেই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। কারণ সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলকে যেমন জলবায়ু জনিত নানান দুর্যোগ থেকে রক্ষা করছে একইভাবে কার্বন নিঃসরণ করে জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দিচ্ছে। কিন্তু নানান বিধ্বংসী কার্যক্রম এই সুন্দরবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবন রক্ষায় দেশ ও বিশ্ববাসীকে সোচ্চার হতে হবে।
শুক্রবার (২২ মে) খুলনায় দুইদিন ব্যাপী আয়োজিত সুন্দরবন সামিটের সেমিনার সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রিইআর, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, সাজিদা ফাউন্ডেশন এবং স্বপ্নপুরী কল্যাণ সংস্থার যৌথ আয়োজনে দুই দিনব্যাপী এই সামিটে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশের তিন শতাধিক তরুণ জলবায়ু কর্মী অংশ নিয়েছেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। এই বন ধ্বংস হলে উপকূলীয় অঞ্চলের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। কিন্ত আমরা এসব নিয়ে সেভাবে ভাবিনি। বিগত সরকার এখানকার সমস্যাগুলোর কথা না ভেবেই অপরিকল্পিত উন্নয়নের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। জনগণের সকল উদ্বেগ-আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে জোরপূর্বক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এসব নিয়ে যারা প্রতিবাদ করেছে, তাদের জেল-জুলুমের মাধ্যমে হয়রানি করেছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের মানুষ এই ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছে। বর্তমান সরকার পরিবর্তনেরই অংশ। আমরা প্রকৃতিকে রক্ষা করেই উন্নয়ন চাই। আমরা সুন্দরবনকে রক্ষা করতে চাই। এখন আর শুধু সমস্যা নিয়ে আলোচনার সময় নেই, আমাদের দ্রুত কার্যকর ও টেকসই সমাধানে যেতে হবে। আমি এই সামিটের আয়োজনকে সাধুবাদ জানাই। কারণ এর মাধ্যমে শুধু সুন্দরবন সম্পৃক্তরা নয়, সারা দেশ ও বিশ্বের মানুষ সুন্দরবন নিয়ে ভাবছে। এই সামিট থেকে তৈরি হওয়া সবুজ ঘোষণা আমি দায়ীত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব। আমরা সুন্দরবন রক্ষায় তরুণ প্রজন্ম, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
এই অধিবেশনে সরকারের সাথে নাগরিক সমাজ ও যুবশক্তির যৌথ কোলাবোরেশনের ওপর জোর দেন খুলনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিসেস হুরে জান্নাত। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী এবং তরুণদের এই যৌথ কোলাবোরেশন ও যুবশক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ আগামী দিনে এক সবুজ ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখবে।”
দেশের প্রখ্যাত জলবায়ুবিদ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রিইআর-এর উপদেষ্টা ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত সুন্দরবনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরে বলেন, “লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে। এই বন বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক সবুজ উদ্ভাবন ও তরুণদের নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে হবে। এবারের সামিট থেকে যে ‘সবুজ ঘোষণা’ আসছে, তা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের মুখ দেখে।”
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর শরীফ জামিল সুন্দরবনের চারপাশের শিল্পায়ন ও নদী দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে এর চারপাশের নদী ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং তরুণ পরিবেশকর্মীদের সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যুব সমাজ যেভাবে সুন্দরবন রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে, তা আমাদের আশাবাদী করে।”

সামিটের বিষয়ে আয়োজক সংস্থা মিশন গ্রিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি জানান, গতকাল খুলনার জেলখানা ফেরীঘাঁট থেকে সুন্দরবনে যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সামিটের প্রথম দিন আমরা দেশি-বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু কর্মীদের নিয়ে সুন্দরবন সফর করেছি। এই সফরে জলবায়ু কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবানের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। চিহ্নিত সমস্যাগুলোর আলোকে বিশেষজ্ঞ দল বসে সুন্দরবস রক্ষায় একটি সবুজ ঘোষণাপত্র তৈরি করছেন। সামিট শেষে সন্ধ্যায়
প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ‘সুন্দরবন গ্রিন ডিক্লারেশন ২০২৬’ শীর্ষক এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। আমরা এই ঘোষণাপত্রটি সরকার, দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। এই সবুজ ইশতেহার সুন্দরবন সংরক্ষণের লড়াইয়ে একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে বলে আমরা আশা করি।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, বিজিসি ট্রাস্ট্র ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রাণি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রিইয়ারের উপপরিচালক রউফা খানম, কেয়ার এর নবপল্লব প্রকল্পের উপপ্রধান মৃত্যুঞ্জয় দাস, সাজিদা ফাউন্ডেশনের প্রধান গবেষক মো. আব্দুল্লাহ হারুন, সাজিদা ফাউন্ডেশনের যুগ্ম পরিচালক সামিরা মোস্তফা, ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ডিরেক্টর কাজী এমদাদুল হক, খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
For add