পেঁচার দ্বীপের লতিফ, দেড় দশকে সাগরে ফিরিয়েছেন ৫০ হাজার কাছিম

কাছিম প্রজননের হ্যাচারির সামনে আবদুল লতিফ। কক্সবাজারের পেঁচার দ্বীপে

নভেম্বর এলেই বদলে যায় আবদুল লতিফের জীবনযাত্রা। অন্যরা যখন ঘড়ির কাঁটা দেখে দিন গোনেন, তখন তিনি হিসাব রাখেন সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার। গভীর রাতে জোয়ারের সঙ্গে সৈকতে উঠে আসে সামুদ্রিক কাছিম। জনমানবহীন বালুচরে ডিম পেড়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। সেই ডিম খুঁজে বের করে বাচ্চা ফোটানের জন্য নিরাপদে সংরক্ষণের দায়িত্ব যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন কক্সবাজার সদর উপজেলার পেঁচার দ্বীপের বাসিন্দা আবদুল লতিফ।

গত দেড় দশকে লতিফ প্রায় ৫০ হাজার কাছিমের বাচ্চা সমুদ্রে অবমুক্ত করেছেন। কোনো চাকরি নয়, বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচিও নয়—প্রকৃতি ও প্রাণের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁর এই পথচলা।

সংগ্রহ করা ডিমগুলো নিয়ে যাওয়া হয় বিশেষ হ্যাচারিতে। সেখানে সৈকতের মতো পরিবেশ তৈরি করে একই রকম গর্ত করা হয়। লতিফ ওই গর্তে রেখে দেন কাছিমের ডিম। ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে সেগুলো ছেড়ে দেন সমুদ্রে।

‘সমুদ্রের মা হলো কাছিম’

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছে ২২ জুন দুপুরে কথা হয় আবদুল লতিফের সঙ্গে। কেন এসব ডিম সংগ্রহ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বনের মা যেমন গাছ, তেমনি সমুদ্রের মা হলো কাছিম। সমুদ্রে দূষণ বাড়ছে, জেলেদের জালে আটকে কাছিম মারা যাচ্ছে। কাছিমের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাই কাছিম বাঁচাতে ডিম সংগ্রহ করি। হ্যাচারিতে ডিম থেকে নিরাপদে বাচ্চা ফুটিয়ে আবার সমুদ্রে ছেড়ে দিই।’

২০১০ সালে বন অধিদপ্তরের একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কাছিম রক্ষায় উদ্বুদ্ধ হন আবদুল লতিফ। সেই যে শুরু, এরপর আর থামেননি। কক্সবাজার সমুদ্রের হিমছড়ি বন বিভাগের বিট অফিস থেকে রেজু খালের আগপর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সৈকতে রাতে তিনি কাছিমের পায়ের ছাপ খুঁজে বেড়ান। আর সেই পথ ধরে এগোলেই মেলে তাঁর কাঙ্ক্ষিত কাছিমের ডিম।

ডিম কোথায় আছে, তা অন্ধকারে বোঝেন কীভাবে—এমন প্রশ্নে লতিফ বললেন, ‘প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দুবার জোয়ার আসে। দিনে একবার, রাতের একবার। রাতের জোয়ারের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। যদি রাত তিনটায় জোয়ার আসে, তাহলে সমুদ্রে নামি চারটায়। সময়টাই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তিন পোয়া জোয়ার ও এক পোয়া ভাটার সময় ‘অলিভ রিডলে’ প্রজাতির কাছিম সৈকতে উঠে আসে।’

তিন পোয়া জোয়ার আর এক পোয়া ভাটার অর্থ হলো—একটি পরিপূর্ণ জোয়ারের পর যখন ভাটার টান শুরু হয়, সেই সময়টা। এ সময় কাছিম সৈকতে উঠে আসে।

তখন সৈকতে হেঁটে হেঁটে কাছিমের পায়ের ছাপ লক্ষ্য করেন আবদুল লতিফ। পায়ের ছাপ দেখে বুঝতে পারেন, আশপাশে কাছিমের গর্ত আছে। তিনি বলেন, কাছিমরা বেশ বুদ্ধিমান। তারা সাধারণত ছয় থেকে সাতটা গর্ত তৈরি করে। তারপর একটা গর্তে ডিম পাড়ে। গর্তগুলো সাধারণত আট ইঞ্চির মতো গভীর হয়। একটা গর্তে ৭০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত ডিম থাকে।

সৈকত থেকে হ্যাচারিতে

সংগ্রহ করা ডিমগুলো নিয়ে যাওয়া হয় বিশেষ হ্যাচারিতে। সেখানে সৈকতের মতো পরিবেশ তৈরি করে একই রকম গর্ত করা হয়। লতিফ ওই গর্তে রেখে দেন কাছিমের ডিম। ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বের হলে সেগুলো ছেড়ে দেন সমুদ্রে।

সৈকতের বালুর গর্তে প্রাকৃতিকভাবে সামুদ্রিক কাছিমের ডিম ফুটে বাচ্চা হতে পারে। তাহলে কেন সেই গর্ত থেকে ডিম হ্যাচারিতে আনতে হয়?

লতিফ বলেন, সৈকতে থাকা ডিম অনেক সময় জেলেরা তুলে বাজারে বিক্রি করে দেন। অনেক সময় শেয়াল ডিম খেয়ে ফেলে বা কুকুর নষ্ট করে দেয়। আবার জোয়ারেও ডিম ভেসে যায়। এমনিতে জেলেদের জালে আটকা পড়ে অনেক কাছিম মারা যাচ্ছে। তাই সৈকতের ডিমগুলো নষ্ট হলে কাছিমের সংখ্যা আরও কমে যাবে। এ কারণে তিনি সৈকত থেকে ডিম খুঁজে এনে হ্যাচারিতে রাখেন।

হ্যাচারিতে কাছিমের ডিম সংরক্ষণে দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় বলে জানিয়েছেন লতিফ। এর একটি হলো এক্স-সিটু আর অন্যটি ইন-সিটু পদ্ধতি।

ইন-সিটু পদ্ধতিতে কাছিম সৈকতের ওপরের দিকে যেখানে ডিম পাড়ে, সেই স্থান নেট দিয়ে ঘিরে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। আর এক্স-সিটু পদ্ধতি হলো—ডিম পেড়ে রাখার স্থানটি ঝুঁকিপূর্ণ হলে, যেমন কুকুর ও শেয়ালের আক্রমণ বা জোয়ারে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে ডিমগুলো সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে নিয়ে আসা হয়।

কাছিম কেন গুরুত্বপূর্ণ

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তালিকায় অলিভ রিডলে কাছিম ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে এদের সংখ্যা কমছে এবং ভবিষ্যতে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় কাছিমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আবদুল লতিফদের মতো মানুষদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

ভাতা নেই, প্রকল্প নেই। তবু নভেম্বর এলেই আবার জোয়ার-ভাটার প্রহর গুনতে শুরু করবেন আবদুল লতিফ। বালুচরে হেঁটে হেঁটে খুঁজবেন কাছিমের পায়ের ছাপ। কারণ, তিনি জানেন, সমুদ্রের এই সন্তানদের বাঁচাতে না পারলে একদিন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য হারিয়ে যাবে।

 

সর্বশেষ খবর ওশানটাইমস.কম গুগল নিউজ চ্যানেলে।

oceantimesbd.com