ওশানটাইমস ডেস্ক : ১৬ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ২৩:৪১:২৯

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ডে আন্তর্জাতিক মানের একটি সমুদ্র গবেষণা জাহাজ নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে কিল-লেইং অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতীকী হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে বিশেষ মোনাজাত, কেক কাটা ও আনুষ্ঠানিক ডকুমেন্ট হস্তান্তরের মাধ্যমে উদ্বোধনী আয়োজন সম্পন্ন হয়
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই)-এর জন্য নির্মিত হচ্ছে এই অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ। দেশীয় সক্ষমতায় নির্মিতব্য এ প্রকল্পকে সরকারের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডিজাইন প্রতিষ্ঠান কিল মেরিন লিমিটেডের কারিগরি সহায়তায় এবং আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সংস্থা ব্যুরো ভেরিটাসের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শিপইয়ার্ড প্রাঙ্গণে প্রতীকী হাতুড়ির আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে সাইরেন বাজিয়ে কিল-লেইং কার্যক্রম শুরু করা হয়, যা জাহাজ নির্মাণের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হিসেবে বিবেচিত। এরপর অতিথিরা নির্মাণ প্ল্যাটফর্ম ঘুরে দেখেন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র হস্তান্তর কার্যক্রমে অংশ নেন।
প্রকল্প অনুযায়ী, ৩২ মিটার দৈর্ঘ্য, ৮ মিটার প্রস্থ এবং ৪ মিটার গভীরতার এই গবেষণা জাহাজ ঘণ্টায় প্রায় ১৪ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলাচল করতে সক্ষম হবে। এতে ২৫০ টন ডিসপ্লেসমেন্ট সক্ষম একটি আধুনিক প্ল্যাটফর্ম থাকবে, যেখানে মাল্টি বিম ইকো সাউন্ডার (MBES), সিঙ্গেল বিম ইকো সাউন্ডার (SBES), ভাইব্রো কোরার, বক্স কোরার এবং অ্যাকুস্টিক ডপলার কারেন্ট প্রোফাইলার (ADCP) সংযোজন করা হবে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের গভীরতা নির্ণয়, তলদেশের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি, স্রোতের গতি বিশ্লেষণ এবং সামুদ্রিক পরিবেশগত ও জৈবিক গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে জানান প্রকৌশলীরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেনদেশীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জাহাজ নির্মাণ আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এই প্রকল্প সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান, গবেষণা এবং ব্লু-ইকোনমি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, সরকার সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই জাহাজ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে।
খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল একেএম জাকির হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সম্পূর্ণ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এই জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং আমাদের নৌ-শিল্পের সক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ।
তিনি জানান, খুলনা শিপইয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ও বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে, এবং এই প্রকল্প প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক সোসাইটির মহাপরিচালক কমডোর মিনারুল হক বলেন, এই গবেষণা জাহাজ দেশের সমুদ্র গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে। এর মাধ্যমে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও স্রোত সম্পর্কে আধুনিক ও গভীর গবেষণা সম্ভব হবে। সমুদ্র গবেষণায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন দেশের বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও শক্তিশালী করবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নৌবাহিনী, বিওআরআই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং খুলনা শিপইয়ার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অতিথিরা নির্মাণাধীন অবকাঠামো পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।
উদ্বোধনী আয়োজনের অংশ হিসেবে কেক কাটা এবং বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন এবং দেশের উন্নয়নে এর অবদান কামনা করা হয়।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ও বিওআরআইয়ের মধ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় শুধু গবেষণা জাহাজ নয়, একটি সেলফ-সাসটেইন প্ল্যাটফর্ম, দুটি হাইব্রিড কেবিন বোট এবং একটি জেটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণা সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং ব্লু-ইকোনমি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
For add