উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিনের জমিতে বৃষ্টি হলেই নেমে আসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আবর্জনা আর বর্জ্য। ক্ষোভে তিনি বলছেন, তাঁর জমিতে এখন আর ফসল নয় চাষ হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ময়লা আবর্জনা। এই ক্ষোভ শুধু কামাল উদ্দিনের নয়, সবার।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিস্তৃত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে বের হওয়া বর্জ্য এখন একটি বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের রূপ নিচ্ছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, পচনশীল আবর্জনা ও দূষিত পানি ভেসে যাচ্ছে আশপাশের কৃষিজমি, খাল আর জলাশয়ে। সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ছে নাফ নদীতে। আর বর্ষা ঘনিয়ে আসায় স্থানীয়দের উদ্বেগ এখন তুঙ্গে।
ক্যাম্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও ও ওয়াশ সেক্টর। কিন্তু মাঠে তাদের সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান ফল নেই বললেই চলে।
রাজাপালং ইউনিয়নের মেম্বার ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও স্থানীয় মানুষ তার সুফল পাচ্ছেন না। বৃষ্টির সময় ময়লা ভেসে কৃষিজমিতে চলে আসায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘স্থানীয়দের জমি, খাল ও নিচু এলাকায় প্রতিনিয়ত বর্জ্য জমছে। এটি শুধু পরিবেশ দূষণ নয়, মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও সরাসরি আঘাত হানছে।’
অ্যাডভোকেট জসিম আজাদের কথায় উদ্বেগটা আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘এক পশলা বৃষ্টিতেই যদি বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে — সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’
পরিবেশবিদরা বলছেন, পচনশীল বর্জ্য ও দূষিত পানি খাল-জলাশয়ে মিশে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ধ্বংস হচ্ছে। দ্রুত টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ক্ষতি আরও গভীর হবে।
নাফ নদীতেও বাড়ছে দূষণের থাবা
সমস্যা এখন আর শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ নেই। উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্প থেকে বের হওয়া বর্জ্য পালংখালী, থাইংখালী, গয়ালমারা, চিকনছড়া, বালুখালী, বালুখালী কাস্টমস ও ঘুমধুম খালসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক জলপথ ধরে প্রতিদিন গিয়ে পড়ছে নাফ নদীতে।
ফলে নদীর বিভিন্ন অংশে পলি ও আবর্জনা জমে নাব্যতা কমছে। স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। জলজ প্রাণীর বাস্তুতন্ত্র বিপর্যস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নদী থেকে মাছ উঠছে আগের তুলনায় অনেক কম — যা সরাসরি আঘাত হানছে স্থানীয় জেলেদের জীবিকায়।
নাফ নদীতে মাছ ধরে জীবন চালানো জেলে রশিদ আহমদ বলছেন, ‘নাফ নদী শুধু একটি সীমান্ত নদী নয়। এটি এই অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের প্রাণ। এভাবে চলতে থাকলে একদিন নদীটাই মরে যাবে।’
প্রশাসনের সতর্কতা, কর্তৃপক্ষের আশ্বাস
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিফাত আসমা সরাসরি সতর্ক করে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখন শুধু ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ ও কৃষির জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনই কার্যকর ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে স্থানীয় জনগণকে মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই ক্যাম্পের ময়লা ও প্লাস্টিক আশপাশের খাল, জলাশয় ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, সংশ্লিষ্ট এনজিও ও সংস্থাগুলোকে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।



