ঝুঁকি মোকাবিলার ‘শক্তি’ই ঝুঁকিতে

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় জেলাগুলোর জন্য নির্মিত সহায়ক অবকাঠামোগুলোই এখন ঝুঁকিতে। নকশা পরিবর্তন, গোঁজামিল দিয়ে কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশ কিছু অবকাঠামো এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকগুলো আবার নষ্ট হওয়ার পথে। প্রকল্পের আওতাধীন সড়ক ও সেতুতে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। এলজিইডির ‘কোস্টাল ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্প (সিসিআরআইপি)’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়নে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১২টি উপকূলীয় জেলার বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সিসিআরআইপি প্রকল্পটির কাজ ২০১৩ সালে শুরু হয়ে ২০২০ সালে শেষ হয়। ১ হাজার ২৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা খরচ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সড়ক, সেতু, ড্রেনেজ, গ্রোথ সেন্টার ও গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ ও বাজার সেবা উন্নত করা। পাশাপাশি দুর্যোগের সময় জনগণের আশ্রয়ের জন্য সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা। সম্প্রতি এই প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, কার্যক্রমের তদারকিতে এলজিইডির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরদারি ঠিকমতো না থাকায় এবং সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ না করায় টয়লেট, নলকূপ, ড্রেন ইত্যাদি অকেজো হয়ে পড়ছে। বেশ কিছু সড়কে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া এবং আর্থিক ব্যবস্থার অভাব প্রকল্পটিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
প্রকল্পের আওতায় সাতটি নতুন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, আটটির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন এবং একটি গবাদি পশুর জন্য আশ্রয়কেন্দ্র (কেল্লা) নির্মাণ করা হয়। এরই মধ্যে কিছু আশ্রয়কেন্দ্র বসবাসের এলাকা থেকে অনেক দূরে নির্মাণ করা ও চলাচলের সড়ক না থাকায় স্থানীয়রা সময়মতো আশ্রয় নিতে পারে না। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত মহিলা টয়লেট ও আলোর ব্যবস্থাও নেই। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণেরও কোনো কার্যক্রম নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইক্লোন শেল্টারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে অর্থ বরাদ্দ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। কিছু ক্ষেত্রে সাইট নির্বাচন স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই করা হয়েছিল। ফলে জনগণ প্রকল্প থেকে শতভাগ উপকার পাচ্ছে না। রক্ষণাবেক্ষণ না হলে দুর্যোগকালীন সময়ে স্থানীয় জনগণ শেল্টারে আশ্রয় নিতে নিরুৎসাহিত হবে। এর ফলে দুর্যোগকালীন হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিবপুর রাজৈর এবং গৌরনদী উপজেলায় বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশনের জন্য নির্মিত এক ড্রেনের সঙ্গে অন্য ড্রেনের সংযোগ নেই। ভি-টাইপের ড্রেনগুলো উন্মুক্ত থাকায় চলাচলের সময় পথচারী ও যানবাহন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। কিছু সড়ক-সেতু নির্মাণে কার্পেটিং এবং আরসিসি ঢালাইয়ে সঠিকমতো সিমেন্ট ও পিচ ব্যবহার না করায় খোয়া উঠে গিয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো সেতুতে ধারক ওয়ালের স্লব এবং মান সঠিকভাবে করা হয়নি। কোনো কোনো সেতুর ঢাল রাস্তার সঙ্গে সংযোগ সঠিকভাবে করা হয়নি। এ ছাড়া কাজ শেষে ঠিকাদাররা নির্মাণসামগ্রী এবং বেশ কিছু ব্রিজের নিচে ভরাটকৃত মাটি অপসারণ করেনি। যার ফলে বর্ষা মৌসুমে ব্রিজের নিচে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে উজানের ফসল তলিয়ে গিয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এদিকে প্রকল্পের আওতায় কেনা যানবাহনগুলো সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। প্রকল্পের কাজে চারটি জিপ, ১২টি পিকআপভ্যান এবং ৭০টি মোটরসাইকেল কেনা হয়। আইন না মেনে যানবাহনগুলো এলজিইডির প্রধান কার্যালয় এবং জেলা অফিসে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ব্যপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছে আইএমইডি। এমনকি প্রকল্পের কোনো ওয়েবসাইটও নেই। আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের বেসিক কিছু তথ্যে এলজিইডির ওয়েবসাইটে পাওয়া গেলেও প্রকল্পের কোনো ডকুমেন্টস বা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তথ্য শেয়ারের ব্যবস্থা থাকলে ব্যবহার বৃদ্ধি পেত।

এ বিষয়ে আইএমইডির সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, সমাপ্ত প্রকল্পের মূল্যায়নগুলো করা হয় মূলত পরবর্তী সময়ে যাতে ভুলগুলো না হয়। সাধারণত প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নজরদারি না থাকা এবং ফিজিবিলিটি স্টাডি ঠিকমতো না হওয়ার কারণে মূলত সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, এগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করা উচিত। প্রকল্প শেষ করে চলে আসলেই হবে না, দেখভালের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চিহ্নিত সমস্যাগুলো প্রতিবেদন আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সমস্যা সমাধানে তারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেটি জানার জন্য আবার চিঠি দেওয়া হবে।

গাড়ির বিষয়ে আইএমইডি সচিব বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে। কীভাবে গাড়িগুলো উদ্ধার করা যায়, তার জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিকল্পানা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মোহম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া বলেন, প্রকল্পের একটা এক্সিট প্ল্যান থাকা উচিত; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি মানা হয় না। যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের দিকে বেশি করে জোর দেওয়া উচিত।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইডি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের ভাগ্য পরিবর্তন এবং তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছিল; কিন্তু স্থানীয় জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত। এটি একটি বহুমুখী প্রতারণামূলক প্রকল্পের দৃষ্টান্ত।

সূত্র: দৈনিক কালবেলা

সর্বশেষ খবর ওশানটাইমস.কম গুগল নিউজ চ্যানেলে।

Tags: , ,

oceantimesbd.com