ওশানটাইমস ডেস্ক : ৩০ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ১৮:৪১:৫২

সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী হয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি প্রবেশ করছে সুন্দরবনে। নদীর পাড়ে স্তুপ করে রাখা এবং বিভিন্ন হাট বাজার এবং বাসাবাড়ির বর্জ্য ড্রেন দিয়ে নামছে শিবসা ও কপোতাক্ষ সহ সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটক ও যাত্রীবাহী নৌযান থেকে ফেলা অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিক। নদ-নদী হয়ে প্রতিদিন এ-সব বর্জ্য আছড়ে পড়ছে বনের ভিতরে। লাগামহীন এই দূষণের ফলে দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে সুন্দরবনের পরিবেশ। যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য কে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে সরকারি, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু কিছু পদক্ষেপ নিলেও সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদ ও বিশেজ্ঞদের মতে এই মারাত্মক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং সুন্দরবন সুরক্ষায় সম্পূর্ণ আলাদা আইন এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে সুন্দরবন সংলগ্ন পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার নদীর তীরবর্তী হাট-বাজারের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কোন উদ্যোগ কিংবা ব্যবস্থা নেই। ফলে হাট-বাজারের ময়লা আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন কিংবা খালের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ছে। জোয়ার-ভাটায় এসব অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য নদী থেকে ভাসতে ভাসতে সরাসরি চলে যাচ্ছে সুন্দরবনে।
পাইকগাছা পৌর বাজারের পাশেই রয়েছে এলাকার এক সময়ের সবচেয়ে বড় নদী ঐতিহ্যবাহী শিবসা। পৌর সদরের সকল বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য স্তুপ করে রাখা হয়েছে শিবসার পাড়ে। এসব বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থা থাকলে এভাবে নদীর পাড়ে ময়লা আবর্জনার স্তূপ গড়ে উঠতো না বলে জানান উপজেলা ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরামের সভাপতি রমেন্দ্র নাথ সরকার।
এছাড়া পৌরসভার বিভিন্ন ড্রেনের সংযোগ রয়েছে খাল এবং নদীর সঙ্গে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের প্যাকেট বা মোড়কে যেসব পণ্য বা খাদ্য খাবার থাকে তা ব্যবহারের খালি প্যাকেট গুলো ফেলা দেয়া হয় ড্রেনে। ড্রেন থেকে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য খাল ও নদী হয়ে সুন্দরবনে গিয়ে আটকে পড়ছে। পাইকগাছা থানার সামনে এমন একটি ড্রেন রয়েছে, যে ড্রেন থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। ষোলআনা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন বলেন অপরিকল্পিত ভাবে ড্রেন নির্মাণ করার ফলে ড্রেনে ফেলে বর্জ্য খাল এবং নদীতে গিয়ে পড়ছে। ড্রেন গুলোর খাল এবং নদীর সংযোগ স্থলে নেট বা ছাকনী জাতীয় কিছু থাকলে ময়লা আবর্জনা নদীতে গিয়ে পড়তো না।
অনুরূপ ভাবে কপোতাক্ষ নদের তীরেই রয়েছে বাণিজ্যিক কেন্দ্র কপিলমুনি বাজার। এ অঞ্চলের মধ্যে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাট। এই হাটের বেশিরভাগ বর্জ্য ফেলা হয় কপোতাক্ষ নদে। এছাড়া আগড়ঘাটা, চাঁদখালী, বাঁকা, সোলাদানা ও গড়ইখালী সহ কয়রার বিভিন্ন হাট-বাজারের প্লাস্টিক বর্জ্য নদ-নদী হয়ে সরাসরি সুন্দরবনে গিয়ে আটকা পড়ছে।
তাছাড়া ও সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন মালবাহী কার্গো, লঞ্চ, পর্যটকদের নৌযান এবং সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী নৌযান থেকে প্রতিদিন যত্রতত্র এবং নদীতে হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন। সুন্দরবন ও এর আশেপাশের লঞ্চঘাট, খেয়াঘাট এবং নৌযান গুলোতে প্লাস্টিক বর্জ্য রাখার জন্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ( বাক্স) রাখা গেলে প্লাস্টিক দূষণ কমে আসতো বলে মনে করছেন উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর উদয় কুমার মন্ডল।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক উৎপল কুমার বাইন বলেন প্লাস্টিক ও পলিথিন মাটিতে কিংবা পানিতে সহজে পঁচে না। সুন্দরবনের নরম কাদা মাটিতে প্লাস্টিক জমে থাকায় গাছের শ্বাসমূল ঢাকা পড়ছে। যা উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে নদীর পানিতে প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ ও জলজ প্রাণী। অনেক সময় বন্য প্রাণী খাবারের সন্ধানে এসে এসব প্লাস্টিক খেয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ছে।
ইয়ুথ ফর সুন্দরবনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম বলেন প্রকৃতির অন্যন্য সৃষ্টি হচ্ছে সুন্দরবন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ এ বনকে বাঁচাতে প্রশাসন সহ সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নাই।
পলিথিন ও প্লাস্টিকের দূষণ থেকে সুন্দরবন কে রক্ষা করতে কাজ করছে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহ বেশকিছু সামাজিক সংগঠন। এখানে সরকারি উদ্যোগ খুবই সীমিত। তবে জনসচেতনতা বাড়ানো সহ দৈনন্দিন জীবনে পলিথিন ও প্লাস্টিকের কমিয়ে আনতে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রুপান্তর, জার্নালিজম ফর সুন্দরবন, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, ইয়ুথ ফর সুন্দরবন এবং পরিবেশবাদী সংগঠন বনবিবি সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। এ-সব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার প্রশাসন ও জনসাধারণের মধ্যে অনেকটাই সাড়া ফেলেছে। সুন্দরবনের মতো একটি বৃহৎ বনাঞ্চলের সুরক্ষার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় তবে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নিখিল ভদ্র বলেন সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য। কিন্তু যেভাবে প্রতিনিয়ত শিবসা কপোতাক্ষ সহ সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন নদ-নদী হয়ে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য বনের ভিতরে ঢুকছে তাতে বনের ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। এখনই যদি প্লাস্টিকের এই আগ্রাসন বন্ধ করা না যায় তাহলে বনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তিনি বলেন সুন্দরবন কে সব ধরনের দূষণ থেকে বাঁচাতে হবে। এর জন্য বেশি বেশি গবেষণার প্রয়োজন। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, সম্পূর্ণ আলাদা আইন এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
For add