শ্বেত শীতের দেশে: জলবায়ু যুদ্ধের সামনের কাতারে এক গ্রাম ইতোকোর্তোরমিত: পৃথিবীর শেষ প্রান্তে বরফের নিচে টিকে থাকার গল্প।

গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে, মানচিত্রে যেখানে সব রেখা যেন থেমে যায়, সেখানে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম দূরবর্তী ও দুর্গম গ্রাম ইতোকোর্তোরমিত। এই গ্রামের ৩৭০ বাসিন্দা প্রতিদিন লড়াই করেন চরম ঠান্ডা, বিচ্ছিন্নতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে। বছরের নয় মাস গ্রামের চারপাশ সমুদ্রের বরফে ঢাকা থাকে, তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে কুকুরের টানা স্লেজ, স্নোমোবাইল বা হেলিকপ্টার।

গ্রামের প্রতিটি রঙিন ঘরের পেছনে রয়েছে ব্যবহারিক কারণ। লাল ঘরগুলি দোকান, নীল ঘরগুলি মাছ ধরার সরঞ্জামের গুদাম, হলুদ ঘরগুলি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্দেশ করে। এই রঙের কোডিং তীব্র তুষারঝড়ে জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে, যখন দৃষ্টিসীমা প্রায় শূন্য হয়ে যায়।

জীবনযাত্রার চরম ব্যয়বহুলতা এখানকার নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ। গ্রামের একমাত্র সুপারমার্কেট পিলেরুইসোকে এক লিটার দুধের দাম প্রায় ১,৬৫০ টাকা, একটি আপেল ৫৫০ টাকা। বছরে মাত্র দুবার জাহাজে করে পণ্য আসে জুলাই ও আগস্ট মাসে, যা পুরো বছরের চাহিদা মেটাতে হয়। স্থানীয়রা মূলত নির্ভর করে ঐতিহ্যবাহী শিকারের উপর – মাস্ক অক্স, সীল মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তাদের প্রধান খাদ্যের উৎস।

ইনুইট সম্প্রদায়ের হাজার বছরের শিকার ঐতিহ্য আজ জলবায়ু পরিবর্তনের মুখোমুখি। গবেষণা অনুসারে, ১৯৭৯ সাল থেকে এই অঞ্চলের সমুদ্রবরফ ৪০% কমেছে। বরফ জমা শুরু হয় ডিসেম্বরে, যা আগে অক্টোবরে শুরু হত, আর গলতে শুরু করে মে মাস থেকে, যা আগে জুনে শুরু হত। এই পরিবর্তন শিকারের মৌসুম প্রায় ৬ সপ্তাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা সম্প্রদায়ের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

গ্রিনল্যান্ড কুকুর বা ‘কিম্মিত’ নামে পরিচিত এই বিশেষ জাতের কুকুরগুলো ইনুইট সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় এক হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে আনা এই কুকুরগুলো শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, পরিবারের সদস্যের মতো। তারা -৫০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে এবং তাদের বিশেষ শারীরিক গঠন হিমায়িত প্রতিরোধ করে।

জনসংখ্যা হ্রাস ইতোকোর্তোরমিতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৬ সাল থেকে গ্রামের জনসংখ্যা ৩৫% কমে বর্তমানে ৩৭০-এ দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও ভালো চাকরির সন্ধানে তরুণ প্রজন্মের শহরে পাড়ি জওয়াই এই পতনের মূল কারণ। গ্রামের স্কুলে একসময় ৫০ জন শিক্ষার্থী পড়ত, এখন তাদের সংখ্যা মাত্র ১৫।

ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার কেভিন হল ২০২৫ সালে এই গ্রামে তার অভিজ্ঞতা বিবিসিতে লিখেছিলেন। তিনি বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে মাইনাস ৪০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিনি কুকুরের স্লেজে ভ্রমণ করেছিলেন, শিকারিদের কুটিরে রাত্রিযাপন করেছিলেন এবং ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতির বাতাসে স্নোমোবাইল চালিয়েছিলেন। তার মতে, এই ভ্রমণ ছিল “ঠান্ডায় দীক্ষা নেওয়ার মতো” এক অভিজ্ঞতা।

জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি ইতোকোর্তোরমিত আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও শিকার। গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার আগ্রহ এই অঞ্চলকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কিনতে চেয়েছিল ৬০০ বিলিয়ন ডলারে।

তবুও আশার কিছু আলো দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় দূরশিক্ষণ প্রকল্প চালু হয়েছে, যার মাধ্যমে গ্রামের শিশুরা কোপেনহাগেনের শিক্ষকদের সাথে ভার্চুয়াল ক্লাস করতে পারে। কিছু তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষে গ্রামে ফিরে আসছে প্রযুক্তি নিয়ে, যারা ড্রোন ব্যবহার করে বরফের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইনুইট ভাষা ও সংস্কৃতি ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করছে।

ইতোকোর্তোরমিতের গল্প আমাদের শুধু একটি দুর্গম গ্রামের গল্প নয়, এটি মানবিক সংকট, সাংস্কৃতিক টিকে থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের গল্প। এটি প্রশ্ন তোলে উন্নয়ন ও আধুনিকতার নামে আমরা কী হারাচ্ছি? এবং জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে পৃথিবীর প্রান্তবর্তী সম্প্রদায়গুলিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

এই গ্রামের মানুষদের দৈনন্দিন সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বরং একটি বর্তমান বাস্তবতা যা ইতোমধ্যেই সম্প্রদায়গুলির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ইতোকোর্তোরমিতের বাসিন্দাদের প্রতিরোধ ও অভিযোজন ক্ষমতা মানবজাতির সহনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

সর্বশেষ খবর ওশানটাইমস.কম গুগল নিউজ চ্যানেলে।

Tags: , ,

সব সংবাদ

শ্বেত শীতের দেশে: জলবায়ু যুদ্ধের সামনের কাতারে এক গ্রাম ইতোকোর্তোরমিত: পৃথিবীর শেষ প্রান্তে বরফের নিচে টিকে থাকার গল্প। জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে দুর্যোগ, তবে প্রাণহানি কম সাগরের ঢেউয়ে হুমকির মুখে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্র কটকা সাগরে ভাসছে শতাধিক জাহাজ – লাইটারেজ সংকটে পণ্য খালাস ব্যাহত গভীর রাতে বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপ উদ্ধার করে সাগরে অবমুক্ত জাহাজ চলাচল বন্ধ, ৮ দিনেও সেন্ট মার্টিন যাননি কোনো পর্যটক চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ অনিশ্চিত শুরু হয়েও হলো না শুরু সেন্টমার্টিন যাত্রা সেন্ট মার্টিনে কাঁটাযুক্ত পটকা মাছ: পরিবেশ রক্ষার সুফল! সেন্টমার্টিন দ্বীপে যেতে মানতে হবে ১২ নির্দেশনা

For add

oceantimesbd.com